অ্যাপলের ঝুলিতে ৫ নতুন চমক: স্মার্ট হোম হাব থেকে ফোল্ডেবল আইফোন

প্রযুক্তি

প্রযুক্তি বিশ্বে অ্যাপলকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। প্রতিবারের মতো এবারও অ্যাপল তাদের প্রচলিত পণ্যগুলোর আপডেট আনার পাশাপাশি সম্পূর্ণ নতুন পাঁচটি পণ্য বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছরেই অ্যাপল ভক্তরা স্মার্ট হোম হাব, ফেস আইডুক্ত ডোরবেল, এ১৮ প্রো চিপসেটের ম্যাকবুক, বহুল প্রতীক্ষিত ফোল্ডেবল আইফোন এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি বা এআই গ্লাসের দেখা পেতে পারেন। অ্যাপলের অন্দরমহলের খবর এবং প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের তথ্যের ভিত্তিতে এসব পণ্যের সম্ভাব্য ফিচার ও বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো।

স্মার্ট হোমে অ্যাপলের নতুন বিপ্লব

অ্যাপলের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘স্মার্ট হোম হাব’ নিয়ে প্রযুক্তি বাজারে আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। মূলত গত বছরেই এটি উন্মোচনের কথা থাকলেও সিরির আরও উন্নত ও ব্যক্তিগতকরণ সংস্করণ প্রস্তুত না থাকায় এর ঘোষণা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এবার অপেক্ষার পালা শেষ হতে পারে। খবর রটেছে, এই হাবে ৬ থেকে ৭ ইঞ্চির একটি চারকোনা ডিসপ্লে থাকবে এবং অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স সাপোর্টের জন্য এতে ব্যবহার করা হবে শক্তিশালী এ১৮ চিপ।

ডিভাইসটি এমনভাবে ডিজাইন করা হচ্ছে যাতে এটি স্পিকার বেসের সাথে যুক্ত করা যায় অথবা দেয়ালে মাউন্ট করা সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা খুব সহজেই স্মার্ট হোমের অন্যান্য অ্যাকসেসরিজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন, ফেসটাইমে ভিডিও কল করতে পারবেন এবং এটি বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা হোম সিকিউরিটি সিস্টেম হিসেবেও কাজ করবে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অ্যাপলের নিজস্ব স্মার্ট ডোরবেল। গত ডিসেম্বরে ব্লুমবার্গের মার্ক গুরম্যান জানিয়েছিলেন যে, অ্যাপল ফেস আইডি সুবিধাযুক্ত একটি স্মার্ট ডোরবেল এবং লক সিস্টেম নিয়ে কাজ করছে। তার মতে, এই ডোরবেলটি তারবিহীন বা ওয়্যারলেস উপায়ে দরজার লকের সাথে সংযুক্ত থাকবে। যদিও গুরম্যানের মতে এটি ২০২৬ সালের আগে বাজারে আসার সম্ভাবনা কম, তবে যদি কাজের গতি বাড়ে তবে চলতি বছরেই এর ঘোষণা আসতে পারে। অ্যাপল বরাবরই গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার ওপর জোর দেয়, তাই এই ডোরবেলেও ‘হোমকিট সিকিউর ভিডিও’ সেবা এবং ‘সিকিউর এনক্লেভ’ প্রযুক্তি থাকার কথা রয়েছে, যা ব্যবহারকারীর ভিডিও ফুটেজ আইক্লাউডে নিরাপদ রাখবে।

সাশ্রয়ী ম্যাকবুক ও এ১৮ প্রো চিপের ক্ষমতা

ম্যাকবুক লাভারদের জন্য সুখবর হলো, অ্যাপল এবার ম্যাকবুক এয়ারের চেয়েও সাশ্রয়ী একটি মডেল বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, এই নতুন ল্যাপটপে আইফোন ১৬ প্রোর এ১৮ প্রো চিপ ব্যবহার করা হতে পারে। অ্যাপল সাপ্লাই চেইন বিশ্লেষক মিং-চি কুও সর্বপ্রথম এই সাশ্রয়ী ম্যাকবুকের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তার মতে, এটি অনেকটা ১২ ইঞ্চির ম্যাকবুকের মতো হালকা ও পাতলা ডিজাইনের হতে পারে এবং সিলভার, ব্লু, পিংক ও ইয়েলো—এই চারটি রঙে পাওয়া যেতে পারে।

আইফোন ১৬ প্রো-তে ব্যবহৃত এ১৮ প্রো চিপে ৬-কোরের সিপিইউ এবং জিপিইউ থাকে, যার পারফরম্যান্স অ্যাপলের এম১ চিপের মতোই শক্তিশালী। ফলে এই নতুন ম্যাকবুকটি এম১ চিপযুক্ত পুরোনো ম্যাকবুক এয়ারের একটি চমৎকার বিকল্প হতে পারে। বর্তমানে এম১ ম্যাকবুক এয়ার ৫৯৯ ডলারে বিক্রি হলেও, নতুন এই মডেলের দাম ৬৯৯ থেকে ৭৯৯ ডলারের মধ্যে হতে পারে। তবে দাম কমাতে এতে র‍্যাম রাখা হতে পারে মাত্র ৮ জিবি এবং থান্ডারবোল্ট পোর্টের বদলে সাধারণ ইউএসবি-সি পোর্ট থাকার সম্ভাবনা বেশি, যা ডাটা ট্রান্সফারের গতি কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে।

ফোল্ডেবল আইফোনের অপেক্ষা

বছরের পর বছর ধরে চলা গুজবের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরেই আইফোন ১৮ প্রো সিরিজের পাশাপাশি অ্যাপলের প্রথম ফোল্ডেবল আইফোন বাজারে আসতে পারে। স্যামসাং গ্যালাক্সি জেড ফোল্ড ৭-এর মতো এটিও বইয়ের মতো খোলা যাবে এবং ভিডিও দেখা বা গেম খেলার জন্য বিশাল স্ক্রিন সুবিধা দেবে।

শোনা যাচ্ছে, এই ফোনের ভেতরের ডিসপ্লেটি হবে ৭.৭ ইঞ্চির এবং বাইরের ডিসপ্লেটি ৫.৩ ইঞ্চির। স্যামসাংয়ের তৈরি এই ডিসপ্লেতে ভাঁজ বা ‘ক্রিজ’ প্রায় থাকবেই না বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, ফেস আইডির পরিবর্তে এই ফোনে টাচ আইডি পাওয়ার বাটন থাকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিশ্লেষক মিং-চি কুও। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটি হতে যাচ্ছে অ্যাপলের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আইফোন।

এআই ওয়্যারেবল ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তি

অ্যাপল শুধু ফোন বা ল্যাপটপেই সীমাবদ্ধ নেই, তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত একটি ওয়্যারেবল ডিভাইস নিয়েও কাজ করছে। ‘দ্য ইনফরমেশন’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ডিভাইসটি দেখতে অনেকটা এয়ারট্যাগের মতো হবে—গোলাকার, পাতলা এবং অ্যালুমিনিয়াম ও গ্লাসের তৈরি। এতে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন থাকবে যা ব্যবহারকারীর চারপাশের পরিবেশ বুঝতে সাহায্য করবে। ডিভাইসটিতে স্ট্যান্ডার্ড ও ওয়াইড-এঙ্গেল লেন্স, তিনটি মাইক্রোফোন, একটি স্পিকার এবং ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা থাকার কথা রয়েছে।

যদিও এই এআই পিন বা ডিভাইসটি বর্তমানে প্রাথমিক বা ‘আর্লি স্টেজ’ ডেভেলপমেন্টে রয়েছে এবং ২০২৭ সালের আগে বাজারে আসার সম্ভাবনা কম, তবুও অ্যাপলের এই উদ্যোগ প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অ্যাপল ইতিমধ্যেই গুগলের সাথে পার্টনারশিপের মাধ্যমে সিরিকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলছে এবং আগামীতে আইফোন, আইপ্যাড ও ম্যাকে নিজস্ব এআই চ্যাটবট যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। অন্যান্য কোম্পানিগুলো যখন তাদের ওয়্যারেবল ডিভাইসে এআই যুক্ত করতে ব্যস্ত, অ্যাপল তখন সম্পূর্ণ নতুন একটি ক্যাটাগরি তৈরি করতে ধীরস্থিরভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।