বর্তমান বিশ্বের আর্থিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে বিনিয়োগ শিক্ষার সঙ্গে জড়িত অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারের তথ্য এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিক্ষিপ্ত, তথ্যের ভলিউম বা পরিমাণও বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। এই জটিলতা নিরসনে এবং বিনিয়োগ শিক্ষাকে আরও সহজলুভ্য করতে এসএনএ কমিউনিটি (SNA Community) নিয়ে এসেছে তাদের নতুন এআই-সম্বলিত সিস্টেম ‘অ্যালগোএজ ৫.০’ (AlgoEdge 5.0)। নিউ ইয়র্ক থেকে গত ৭ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে এক ঘোষণায় প্রতিষ্ঠানটি এই নতুন প্রযুক্তির উন্মোচন করে।
বিনিয়োগ শিক্ষায় নতুন অধ্যায়
এসএনএ কমিউনিটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান গবেষক ব্র্যান্ডন মার্সারের নেতৃত্বে এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। অ্যালগোএজ ৫.০ মূলত এমন একটি সিস্টেম যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের জটিল সব বাজার বিশ্লেষণ বুঝতে সহায়তা করবে। বর্তমানে অনেক বিশ্লেষণী বা অ্যানালিটিক্যাল টুল প্রচলিত শিক্ষা প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন থাকে, ফলে বাজারের আচরণ বা মার্কেট বিহেভিয়ার সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করা শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এসএনএ কমিউনিটির মতে, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার মূল কারণ চেষ্টার অভাব নয়, বরং অগোছালো বাজার তথ্যকে একটি সুসংহত বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপান্তর করতে না পারা। অ্যালগোএজ ৫.০ ঠিক এই সমস্যাটি সমাধানের লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্লেষণী দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তির ছোঁয়া
ব্র্যান্ডন মার্সার জোর দিয়ে বলেছেন, অ্যালগোএজ ৫.০-এর মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের হাতে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত তুলে দেওয়া নয়, বরং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বা কগনিটিভ উন্নয়নে সহায়তা করা। এটি শিক্ষার্থীদের তথ্য গুছিয়ে নিতে, ঝুঁকির বিষয়গুলো মূল্যায়ন করতে এবং ধীরে ধীরে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখাবে। বিভিন্ন ধরনের ডেটা বিশ্লেষণ পদ্ধতিকে একীভূত করে এই সিস্টেমটি কোর্সওয়ার্ক, গবেষণামূলক আলোচনা এবং বাজার পর্যবেক্ষণের সময় ব্যবহারকারীদের পাশে থাকবে। এসএনএ কমিউনিটির বৃহত্তর শিক্ষা ইকোসিস্টেমের অংশ হিসেবে এটি এখন থেকে শিক্ষামূলক কন্টেন্ট ও গবেষণার পাশাপাশি একটি সহায়ক টুল হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্বজুড়ে শিক্ষায় প্রযুক্তির জোয়ার
এসএনএ কমিউনিটির এই উদ্যোগটি এমন এক সময়ে এল যখন বিশ্বজুড়েই শিক্ষাক্ষেত্রে বা এডটেক (EdTech) খাতে এআই-এর ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। গত ডিসেম্বর মাসজুড়েই দেখা গেছে কীভাবে এআই কৌশলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তরিত হচ্ছে। শিক্ষার প্রতিটি স্তরে, জাতীয় অংশীদারিত্ব থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসভিত্তিক এআই সুবিধা—সবকিছুতেই এখন পরীক্ষামূলক পর্যায় পার করে বাস্তবায়নের দিকে ঝোঁক বাড়ছে। ডিসেম্বরের সেরা দশটি এডটেক খবরের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা এখন স্কেল বা পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার জায়গাতেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।
জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে বড় উদ্যোগ
ডিসেম্বরের শুরুতেই যুক্তরাজ্য সরকার গুগল ডিপমাইন্ডের (Google DeepMind) সঙ্গে বিজ্ঞান, শিক্ষা ও জনসেবা খাতে একটি বিশাল অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেয়। এর আওতায় যুক্তরাজ্যের গবেষকরা উন্নত এআই মডেলগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রবেশের সুযোগ পাবেন, যা জাতীয় এআই কৌশলের সঙ্গে শিক্ষাকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ডার্টমাউথ কলেজ প্রথমবারের মতো পুরো ক্যাম্পাসে ‘ক্লদ এআই’ (Claude AI) ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য এআই-কে একটি ঐচ্ছিক টুলের বদলে নিত্যদিনের প্রাতিষ্ঠানিক অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। পাশাপাশি, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি (NYU) গণিত, কম্পিউটিং এবং ডেটা সায়েন্সকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসার জন্য একটি নতুন স্কুল খোলার ঘোষণা দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার পথ সুগম করবে।
কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রের প্রশিক্ষণেও এআই তার প্রভাব বিস্তার করছে। পিয়ারসন এবং আইবিএম-এর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে নতুন এআই লার্নিং টুল, যা আলাদা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বদলে কাজের পরিবেশের মধ্যেই শেখার সুযোগ করে দেবে। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি শঙ্কার জায়গাও নেহাত কম নয়। অ্যাকশন-১ (Action1) এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, র্যানসামওয়্যার এবং এআই-চালিত সাইবার হামলার মোকাবেলায় অধিকাংশ স্কুল এখনো প্রস্তুত নয়। বাজেটের ঘাটতি না থাকলেও কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দক্ষ জনবলের অভাবে সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
ভবিষ্যতের পথে প্রযুক্তি ও সতর্কতা
কর্মক্ষেত্রে এআই-এর প্রভাব নিয়ে অ্যানথ্রপিক-এর (Anthropic) একটি বড় আকারের সাক্ষাৎকারভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রির কর্মীরা গতি বাড়ার কথা বললেও তাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে, অন্যদিকে বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয়। এরই মাঝে ওপেনএআই (OpenAI) কিশোর-কিশোরীদের জন্য চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে, যা প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহারের দিকটিকেই নির্দেশ করে। সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের দিকে তাকিয়ে এটা স্পষ্ট যে, এসএনএ কমিউনিটির অ্যালগোএজ ৫.০-এর মতো উদ্যোগগুলো এবং বৈশ্বিক এডটেক খাতের এই পরিবর্তনগুলো শিক্ষাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী করে তুলছে।