মস্কো জয়ের পর এবার নিউ ইয়র্কে ‘আদিম’-এর হ্যাটট্রিক, ওদিকে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছে সানি দেওলের ‘বর্ডার ২’

বিনোদন

চলচ্চিত্র অঙ্গনে বইছে অর্জনের সুবাতাস। একদিকে বাংলাদেশের গণঅর্থায়নে নির্মিত স্বাধীন চলচ্চিত্র বিশ্বমঞ্চে একের পর এক স্বীকৃতি কুড়িয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে বলিউডের বাণিজ্যিক ধারার সিনেমা গড়ছে আয়ের নতুন রেকর্ড। মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে নেটপ্যাক জুরি অ্যাওয়ার্ড জয়ের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে ‘কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভাল’-এ তিনটি ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পেয়েছে যুবরাজ শামীম পরিচালিত সিনেমা ‘আদিম’। সমান্তরালভাবে বলিউডে সানি দেওল অভিনীত যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘বর্ডার ২’ বক্স অফিসে রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

নিউ ইয়র্কের উৎসবে ‘আদিম’-এর জয়জয়কার

আগামী ১ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চলতে যাওয়া কুইন্স ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘আদিম’ তার শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিয়েছে। উৎসব কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট ও নির্মাতার দেওয়া তথ্যমতে, এই চলচ্চিত্রটি ‘ন্যারেটিভ ফিচার ফিল্ম’ বিভাগে সেরা সিনেমা, সেরা পরিচালক এবং সেরা সিনেমাটোগ্রাফির জন্য মনোনয়ন পেয়েছে। গণঅর্থায়নের এই সিনেমাটি এর আগে গত সেপ্টেম্বরে মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও বিশেষ সম্মাননা অর্জন করেছিল। নিউ ইয়র্কে বসবাসরত প্রবাসীদের জন্য সুখবর হলো, আগামী ৫ নভেম্বর উৎসবটিতে ‘আদিম’ প্রদর্শিত হবে। নির্মাতা যুবরাজ শামীম ইতিমধ্যেই সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের সিনেমাটি দেখার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন এবং টিকিট বুকিংও শুরু হয়ে গেছে।

নেপথ্যের সংগ্রাম ও সাহসিকতা

পর্দার সাফল্যের পেছনের গল্পটা অবশ্য মোটেও মসৃণ ছিল না। পরিচালক শামীম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই উৎসবে অংশ নেওয়ার তিক্ত-মিষ্টি অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন। উৎসব কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুযায়ী ১০৫ গিগাবাইটের বিশাল ‘প্রোরেজ ফাইল’ পাঠানো নিয়ে তাকে চরম বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। একে তো ধীরগতির ইন্টারনেট, তার ওপর বিদ্যুতের আসা-যাওয়া এবং আইপিএস বা ইউপিএস না থাকায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে উৎসবের প্রচারমূলক পর্ব ‘ট্রেইলার পার্টি’ থেকে সিনেমাটি বাদ পড়লে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নির্মাতা।

উৎসব প্রধানের সঙ্গে ইমেইলে যোগাযোগের পর জানা যায়, ফাইল না পাওয়ায় মূল প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে স্থানীয় বিভাগে রাখা হয়েছে সিনেমাটিকে। কিন্তু দমে যাননি শামীম। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা অকপটে জানিয়ে আরও দুদিন সময় চেয়ে নেন। স্থানীয় এক শুভাকাঙ্ক্ষীর সহায়তায় শেষ পর্যন্ত ফাইল পাঠাতে সক্ষম হন। আর সেই প্রচেষ্টার ফল আসে হাতেনাতে—ভোরবেলা উৎসব কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে ‘আদিম’ মূল প্রতিযোগিতার তিনটি ক্যাটাগরিতেই মনোনয়ন পেয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফার আমীর হামজার এই অর্জনকে নির্মাতা তার নিজের চেয়েও বড় করে দেখছেন।

টঙ্গীর বস্তি থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে

‘আদিম’-এর নির্মাণশৈলী আর দশটা সাধারণ সিনেমার মতো নয়। এই সিনেমায় কোনো পেশাদার অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই। বাদশা, দুলাল, সোহাগী, সাদেক—এরা সবাই যে যার নিজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চিত্রগ্রহণে ছিলেন আমীর হামজা এবং শব্দ ও রঙের বিন্যাস করেছেন সুজন মাহমুদ। চরিত্রগুলোকে বাস্তবসম্মত করে তুলতে নির্মাতা টানা সাত মাস টঙ্গীর ব্যাংক মাঠ বস্তিতে বসবাস করেছেন। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মহড়া করিয়ে তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়েছেন।

এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তাকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কখনো পুলিশ তাকে মাদকসেবী সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে, আবার কখনো স্থানীয় মাদক কারবারিরা সাংবাদিক ভেবে হুমকি দিয়েছে। তবুও পিছু হতেননি তিনি। প্রতিটি শেয়ার পাঁচ হাজার টাকা দরে বিক্রি করে সাধারণ মানুষের টাকায় নির্মিত এই সিনেমা আজ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকাকে সমুন্নত করছে।

বক্স অফিসে সানি দেওলের রাজত্ব

বাংলাদেশের স্বাধীন যখন চলচ্চিত্রের এই লড়াই চলছে, তখন বলিউডে চলছে বাণিজ্যিক সিনেমার ধামাকা। অনুরাগ সিং পরিচালিত এবং সানি দেওল অভিনীত ‘বর্ডার ২’ মুক্তির পর থেকেই বক্স অফিসে রাজত্ব করছে। বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটি রুপি আয়ের মাইলফলক ছোঁয়ার পথে রয়েছে এই সিনেমাটি। মুক্তির প্রথম চার দিনেই এটি ১৮০ কোটি রুপি আয় করে নেয়। প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটির কারণে চতুর্থ দিনে বড়সড় আয় হলেও পঞ্চম দিনে অর্থাৎ মঙ্গলবার আয়ে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে তা সত্ত্বেও ভারতে সিনেমাটির মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ রুপির ঘরে।

ইন্ডাস্ট্রি ট্র্যাকার স্যাকনিল্কের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ‘বর্ডার ২’-এর মোট আয় এখন পর্যন্ত ২৭৭ কোটি রুপি, যার মধ্যে ভারতের বাইরে থেকেই এসেছে প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি রুপি। টি-সিরিজ সোশ্যাল মিডিয়ায় সিনেমাটির এই সাফল্যকে ‘হিন্দুস্তানের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত গল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আয়ের দিক থেকে এটি ইতিমধ্যেই আমির খানের ‘সিতারে জমিন পার’ এবং কার্তিক আরিয়ানের ‘ভুল ভুলাইয়া ২’-এর আজীবন আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। ভূষণ কুমার ও জেপি দত্ত প্রযোজিত এই সিনেমায় সানি দেওল ছাড়াও বরুণ ধাওয়ান, দিলজিৎ দোসাঞ্জ, আহান শেঠি এবং সোনম বাজওয়ার মতো তারকারা অভিনয় করেছেন।