শ্রেণিকক্ষে এআই: গুগল ও ওপেনএআই কীভাবে বদলে দিচ্ছে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার চিত্র

শিক্ষা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যে শিক্ষাব্যবস্থাকে খোলনলচে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তা নিয়ে এখন আর তেমন কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু এসব টুল সত্যিই কতটা কাজে আসছে, তা বুঝতে হলে শ্রেণিকক্ষে এদের বাস্তব প্রভাব মাপাটা খুব জরুরি। একইসঙ্গে শিক্ষকদেরও এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা দরকার। ঠিক এই লক্ষ্যেই গুগল এবং ওপেনএআই বিশ্বজুড়ে নিজেদের গ্লোবাল এডুকেশন ইনিশিয়েটিভ সম্প্রসারণ করছে, আর শুরুর দিককার ফলাফলগুলো রীতিমতো অবাক করার মতো। সরকারি পর্যায়ের গবেষণা অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় এআই টুলগুলোকে নিরাপদে ও কার্যকরভাবে একীভূত করার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছে এখন।

শিক্ষার্থীদের দক্ষতায় চোখে পড়ার মতো উল্লম্ফন

গুগলের জেমিনি মডেলগুলো আসলে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে কেমন প্রভাব ফেলে, তা যাচাই করতে তারা সিয়েরা লিওনে একটি আট সপ্তাহের প্রি-রেজিস্টার্ড র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়াল (RCT) চালিয়েছিল। সেখানে ফ্যাব এআই (Fab AI) এবং স্থানীয় শিক্ষকদের সাথে নিয়ে ৪৮টি গণিতের ক্লাসের প্রায় ১৮০০ জন সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে দৈবচয়নে বেছে নেওয়া হয়। এদের এক অংশকে ‘গাইডেড লার্নিং’ টুল দেওয়া হয়, আর বাকিরা সাধারণ রুটিন মেনে ক্লাস করতে থাকে।

ফলাফল বলছে, যারা টুলটি ব্যবহার করেছে, ভগ্নাংশ বা মৌলিক সংখ্যার মতো বিষয়গুলোতে তাদের দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক্সটার্নালি ভ্যালিডেটেড অ্যাসেসমেন্টে তাদের স্কোর +০.২৬ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন পর্যন্ত বেড়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে প্রায় ১.২ থেকে ১.৭ বছরের স্বাভাবিক শেখার অগ্রগতির সমান। মজার ব্যাপার হলো, এডটেক টুলগুলো নিয়ে সাধারণত শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ধরে রাখাটা বেশ কঠিন হলেও এখানে চিত্রটা ছিল ভিন্ন। শিক্ষার্থীদের গড়ের হিসেবে জেমিনি ব্যবহারের সময় ছিল ১৫ ঘণ্টা এবং ৬৯ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের জন্য নির্ধারিত ১২ ঘণ্টার থ্রেশোল্ড পার করেছিল। যারা রেকমেন্ডেড সময় ধরে এটি ব্যবহার করেছে, তাদের স্কোর +০.৩৮ স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন পর্যন্ত বেড়েছে, যা একজন গড়পড়তা শিক্ষার্থীকে ক্লাসের মাঝামাঝি অবস্থান থেকে সোজা শীর্ষ এক-তৃতীয়াংশে নিয়ে আসার জন্য যথেষ্ট।

ওপেনএআই-এর ‘এডুকেশন ফর কান্ট্রিস’ প্রোগ্রামের প্রথম ধাপের দেশগুলোতেও এমন আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখা যাচ্ছে। এস্তোনিয়া তাদের ২০ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৪৬০০ শিক্ষকের জন্য চ্যাটজিপিটি এডু (ChatGPT Edu) ব্যবহার করছে মূলত লোকালাইজেশন এবং শেখার ওপর এআইয়ের প্রভাব মাপতে। অন্যদিকে জর্ডানে ‘সিরাজ’ নামের এআই এডুকেশন অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী এবং এক লাখ শিক্ষক।

শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন ও কাজের চাপ কমানো

প্রযুক্তির সুবিধা শুধু শিক্ষার্থীরাই পাচ্ছে না, শিক্ষকরাও দারুণভাবে উপকৃত হচ্ছেন। ইতালির উত্তরাঞ্চলে ডন বস্কো স্কুল নেটওয়ার্কে গুগল একটি বড়সড় স্টাডি করেছে। প্রাথমিক থেকে ভোকেশনাল কলেজ পর্যন্ত বিস্তৃত এই গবেষণায় ৭০০ জন শিক্ষক এবং ৯০০০ শিক্ষার্থীর মাঝে ৫৬০টির বেশি বিস্তারিত টিচিং অ্যাক্টিভিটি, সার্ভে ও ফোকাস গ্রুপ পরিচালনা করা হয়।

কন্টেন্ট তৈরি এবং স্ক্যাফোল্ডিংয়ের কাজে ‘জেমিনি ফর এডুকেশন’ ব্যবহার করে শিক্ষকরা তাদের লার্নিং ম্যাটেরিয়ালগুলো খুব সহজেই পার্সোনালাইজ করতে পেরেছেন। এর ফলশ্রুতিতে শিক্ষকরা দেখেছেন, প্যারাবোলার জ্যামিতি হিসেব করা থেকে শুরু করে জাভা কোড লেখা পর্যন্ত— প্রতিটি ক্লাসের ৮০-৯৯ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের নির্ধারিত লেসন স্কিলগুলো সফলভাবে আয়ত্ত করতে পেরেছে। সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো, শিক্ষকদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বা দাপ্তরিক কাজের পেছনে ব্যয় করা সময় প্রায় ৭০ ভাগ কমে গেছে। বেঁচে যাওয়া এই অমূল্য সময়টুকু তারা শিক্ষার্থীদের ওয়ান-টু-ওয়ান মেন্টরশিপ এবং মানসিক সাপোর্টের পেছনে দিতে পেরেছেন।

স্লোভাকিয়া ও কাজাখস্তানে ওপেনএআই-এর উদ্যোগে ঠিক এমনটাই দেখা গেছে। স্লোভাকিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, এআইয়ের কারণে তাদের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে এবং সপ্তাহে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় বাঁচছে। এমনকি তাদের শিক্ষামন্ত্রণালয়ের একটি দল ওয়ার্কস্পেস এজেন্ট ব্যবহার করে শিক্ষকদের প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ডের খসড়া তৈরির কাজও দ্রুত সারতে পেরেছে। ওদিকে কাজাখস্তানে প্রায় ৮৪ হাজার শিক্ষক তাদের এআই রেডিনেস ট্রেনিং শেষ করেছেন এবং তারা শিক্ষাক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটি এডু-কে ভীষণ কার্যকরী বলে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বজুড়ে এআই লিটারেসি ছড়ানোর নতুন উদ্যোগ

নতুন প্রযুক্তি নিয়ে শিক্ষকদের আগ্রহ থাকলেও ক্লাসরুমে সেটা ঠিকঠাক ব্যবহার করার মতো দক্ষতা অর্জন করাটা অনেক সময়ই চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘাটতি পূরণে গুগল তাদের ‘এআই এডুকেটর সিরিজ’ ভারতে সম্প্রসারণ করছে। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, আসাম, লাদাখ এবং পাঞ্জাব স্কুল এডুকেশন বোর্ডের সাথে হাত মিলিয়ে তারা ভারতীয় শিক্ষকদের জন্য কাস্টমাইজড এবং মোবাইল-ফার্স্ট ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। এটি যেন সবার কাছে পৌঁছায়, সেজন্য প্রথম বছরেই অসমীয়া, হিন্দি, মারাঠি, তেলুগু, ওড়িয়া এবং পাঞ্জাবি— এই ছয়টি ভাষায় ট্রেনিংটি লোকাল রূপ পাচ্ছে।

একইভাবে আফ্রিকান ইউনিয়ন কমিশনের সাথে গুগলের পার্টনারশিপ ৫৫টি সদস্য রাষ্ট্রের সবকটিতে এআই লিটারেসি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। ঘানা বিশ্ববিদ্যালয় বা কোয়ামে এনক্রুমাহ ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য জেমিনি ফর এডুকেশন এবং নোটবুকএলএম নিয়ে আসা হচ্ছে। বিনামূল্যে প্রোডাক্ট অনবোর্ডিং এবং ট্রেনিং প্লেবুক দিয়ে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাপ্তরিক কাজের বোঝা কমানোর চেষ্টা চলছে, যেন তারা উচ্চস্তরের পাঠদানে পুরোপুরি ফোকাস করতে পারেন।

এই বৈশ্বিক তরঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সিঙ্গাপুর। যুবসমাজের মাঝে এআই অ্যাডপশনে বেশ এগিয়ে থাকা দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই বেশ শক্তিশালী। সিঙ্গাপুরের শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং গভটেক-এর সাথে ওপেনএআই-এর এই পার্টনারশিপ মূলত এআই লিটারেসি বাড়ানো, পার্সোনালাইজড লার্নিং এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করার ওপর জোর দিচ্ছে। শিক্ষকদের হাতে এআইয়ের লাগাম তুলে দিতে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ও হ্যাকথনের মতো উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

শ্রেণিকক্ষের এই ইনসাইটগুলো সামনে আরও উন্নত প্রোডাক্ট ডিজাইনে বড় ভূমিকা রাখবে। গ্রিস, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আর্লি অ্যাডপ্টার দেশগুলো যেভাবে এআই ডিপ্লয়মেন্ট পাইলট করছে, তা থেকে এটা স্পষ্ট যে, শিক্ষার কনটেক্সটে টুলগুলোর পরিমার্জন শুধু শেখার মানই বাড়াচ্ছে না, ভবিষ্যতের অনেক অর্থনৈতিক সুযোগের দরজাও খুলে দিচ্ছে।