শাওমি এখন আর কেবল স্মার্টফোন তৈরির মধ্যে নিজেদের আটকে রাখছে না। তাদের ‘হিউম্যান এক্স কার এক্স হোম’ (Human × Car × Home) ইকোসিস্টেমের পরিধি আমাদের বসার ঘর থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিকল্পনারই একটা বড় অংশ হিসেবে তারা সম্প্রতি বাজারে এনেছে বেশ কিছু নতুন স্মার্ট টেক অ্যাপ্লায়েন্স, যার মধ্যে মিজিয়া এয়ার কন্ডিশনার জেন্টলএয়ার এবং মিজিয়া রেফ্রিজারেটর সাইড-বাই-সাইড ৭১৫এল বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। মালয়েশিয়ার বাজারে এই পণ্যগুলোর গ্লোবাল ডেবিউ আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে আরও স্বয়ংক্রিয় করার একটা স্পষ্ট ইঙ্গিত। এই পুরো সিস্টেমটাই শাওমি হোম অ্যাপের সাথে যুক্ত। অর্থাৎ, আপনি চাইলে অফিস থেকে বসেই এসি বা ফ্রিজের অবস্থা দেখতে পারবেন, রিমোট কন্ট্রোল করতে পারবেন, এমনকি গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট বা অ্যালেক্সা ব্যবহার করে শুধু মুখের কথাতেই ঘরের পরিবেশ বদলে ফেলতে পারবেন।
মিজিয়া জেন্টলএয়ার এসির স্মার্ট কুলিং প্রযুক্তি
এসির কথায় আসা যাক। মিজিয়া এয়ার কন্ডিশনার জেন্টলএয়ার ১.০ এবং ১.৫ হর্সপাওয়ার—এই দুটি ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া যাচ্ছে। এর মূল আকর্ষণটা লুকিয়ে আছে এর বাতাস প্রবাহের ধরনে। সরাসরি গায়ে তীক্ষ্ণ বাতাস লাগার যে অস্বস্তি, সেটা দূর করতে এতে ইনোভেটিভ সফট এয়ার ভেন ব্যবহার করা হয়েছে। এর তিনটি দারুণ মোড আছে। হালো ফ্লো (Halo Flow) চারপাশ দিয়ে একটা সুন্দর সার্কুলেশন তৈরি করে, ক্যানোপি ফ্লো (Canopy Flow) ছাদের দিক থেকে পুরো ঘর ঠান্ডা করে, আর কার্পেট ফ্লো (Carpet Flow) নিচ থেকে গরম বাতাসকে প্রাকৃতিকভাবে উপরের দিকে উঠতে সাহায্য করে।
কর্মদক্ষতার দিক থেকেও এটি বেশ ফাস্ট। মাত্র ৩০ সেকেন্ডে ঘর ঠান্ডা আর ৬০ সেকেন্ডে গরম করার ক্ষমতা এর আছে, আর টার্বো মোড চালু করলে মুহূর্তের মধ্যেই সর্বোচ্চ কুলিং বা হিটিং পাওয়া যায়। এর এআই এনার্জি সেভিং মোড পরিবেশ বুঝে নিজে থেকেই কম্প্রেসরের ফ্রিকোয়েন্সি মানিয়ে নেয়, যা মডেলভেদে প্রায় ২৪.৫% পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম। সবচেয়ে দারুণ ব্যাপার হলো, এর এআই আপনার প্রতিদিনের ব্যবহার এবং বাইরের তাপমাত্রার ডেটা বিশ্লেষণ করে নিজে থেকেই সেটিংস অপটিমাইজ করে নেয়। এমনকি ঘরের আলোর ওপর ভিত্তি করে এসির ডিসপ্লের আলোও নিজে থেকে কমে যায়, যাতে আপনার ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
বিশাল স্টোরেজ আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে মিজিয়া রেফ্রিজারেটর
রান্নাঘরের দিকটা সামলাতে মিজিয়া রেফ্রিজারেটর সাইড-বাই-সাইড ৭১৫এল বেশ ভালো একটা অপশন হতে পারে। এর মডার্ন ডিজাইনের ভেতরে জায়গা আছে প্রচুর। ৬৩৫ লিটারের নিট ক্যাপাসিটির মধ্যে ৩৯৪ লিটার রেফ্রিজারেশন আর ২৪১ লিটার ফ্রিজিংয়ের জন্য বরাদ্দ। পুরো সপ্তাহের বাজার, পানীয় বা বড় আয়োজনের খাবারদাবার রাখার জন্য এতে আছে ৪টি লেয়ার এবং ১৮টি আলাদা কম্পার্টমেন্ট।
ডুয়াল ইনভার্টার টেকনোলজির কারণে এর কুলিং সিস্টেম খুবই দ্রুত কাজ করে এবং পুরো ফ্রিজে সমানভাবে তাপমাত্রা বজায় রাখে। এছাড়া এর Ag⁺ ফ্রেশ টেকনোলজি ব্যাকটেরিয়া (যেমন ই. কোলাই) এবং যেকোনো ধরনের দুর্গন্ধ দূর করে খাবারকে বেশিদিন সতেজ রাখে। ফ্রস্ট-ফ্রি কুলিং হওয়ায় বারবার বরফ গলানো বা পরিষ্কার করার কোনো ঝামেলা পোহাতে হয় না। এসির মতো এই ফ্রিজটিও স্মার্টফোন অ্যাপ বা ভয়েস কমান্ড দিয়ে খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
বাজেটের ভেতর প্রিমিয়াম অডিও অভিজ্ঞতা: রেডমি বাডস ৮
ঘরের এই স্মার্ট বিপ্লবের পাশাপাশি, ঘরের বাইরে আমাদের ব্যক্তিগত অডিও অভিজ্ঞতাকেও শাওমি নতুন করে সাজাচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে তারা নিয়ে এসেছে সাশ্রয়ী মূল্যের রেডমি বাডস ৮ (Redmi Buds 8)। এশিয়ার বাজার পেরিয়ে এটি এখন যুক্তরাজ্য এবং জার্মানিতেও জায়গা করে নিয়েছে।
দামের দিক থেকে শাওমির স্ট্র্যাটেজি এবার বেশ আগ্রাসী। যুক্তরাজ্যে এর দাম মাত্র ৪০ পাউন্ড, আর জার্মানিতে লঞ্চ প্রাইস রাখা হয়েছে ৫০ ইউরো। যেখানে অ্যাপলের এয়ারপডস প্রো কিনতে গেলে আপনাকে ২১৯ পাউন্ড গুনতে হবে, সেখানে তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ দামে শাওমি দিচ্ছে অ্যাক্টিভ নয়েজ ক্যান্সেলেশন (ANC) এর মতো প্রিমিয়াম ফিচার। অনেকটা পিসি গেমিংয়ের দুনিয়ায় ভালভ (Valve) যেমন তাদের স্টিম মেশিনের ক্ষেত্রে একটা ডিসরাপ্টিভ প্রাইসিং মডেল এনেছিল, শাওমিও অডিও মার্কেটে ঠিক সেই কাজটাই করছে।
বাজেটের মধ্যে হলেও ফিচারে খুব একটা আপস করা হয়নি। এতে আছে ৫০ ডেসিবল পর্যন্ত নয়েজ রিডাকশন এবং ৪ কিলোহার্টজ নয়েজ-ক্যান্সেলিং ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জ। অর্থাৎ, প্রতিদিনের বাসের বা রাস্তার কোলাহলের মাঝেও আপনি নিজের মতো শান্তিতে গান শুনতে পারবেন। ১১ মিমি ডায়নামিক ড্রাইভারের সাহায্যে এর সাউন্ড কোয়ালিটি বেশ রিচ। হাই-রেজ অডিও এবং এলএইচডিসি (LHDC) কোডেক সাপোর্ট থাকলেও, এলএইচডিসি পুরোপুরি উপভোগ করতে একটা কম্প্যাটিবল স্মার্টফোন এবং ভবিষ্যতের ফার্মওয়্যার আপডেটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়া সাউন্ড কাস্টমাইজেশনের জন্য পাঁচটি প্রি-কনফিগারড ইকুয়ালাইজার এবং সাউন্ড আইডি হিয়ারিং টেস্টের মাধ্যমে নিজস্ব প্রোফাইল তৈরির সুবিধাও থাকছে।
এর ব্যাটারি ব্যাকআপও যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক। নয়েজ ক্যান্সেলেশন বন্ধ রাখলে ইয়ারবাডগুলো টানা ১১ ঘণ্টা চলে, আর চার্জিং কেসসহ সেটা গিয়ে দাঁড়ায় ৪৪ ঘণ্টায়। এএনসি চালু রাখলেও ইয়ারবাড থেকে ৬.৫ ঘণ্টা এবং কেসসহ মোট ২৮ ঘণ্টা ব্যাকআপ পাওয়া যায়। আর তাড়াহুড়োর সময় মাত্র ১০ মিনিট চার্জ দিয়ে ৪ ঘণ্টা গান শোনার সুবিধাটা তো থাকছেই। ব্লুটুথ ৫.৪, গুগল ফাস্ট পেয়ার এবং আইপি৫৪ ডাস্ট ও ওয়াটার রেজিস্ট্যান্সের মতো ফিচারগুলো একে বাইরের ব্যবহারের জন্য একদম পারফেক্ট করে তুলেছে। নাসার পারসিভারেন্স রোভার যেমন মঙ্গলের চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, অনেকটা তেমনি রেডমি বাডস ৮-ও আমাদের রোজকার ধুলোবালি আর ব্যস্ত জীবনের ধকল সামলাতে বেশ পোক্তভাবেই ডিজাইন করা।