বিশ্ব অর্থনীতিতে ইদানীং কিছুটা স্বস্তির হাওয়া বইছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক শান্তি চুক্তির পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে কমতে শুরু করেছে, তা ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশের জন্য বেশ বড় একটা সুখবর। এই বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ভারতের সামষ্টিক অর্থনীতির আগামী দিনের পূর্বাভাস বেশ ইতিবাচকভাবে সংশোধন করেছে। তাদের ‘ইন্ডিয়া: ইম্প্রুভড ম্যাক্রো আউটলুক আফটার দ্য ইউএস-ইরান ডিল’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ ক্যালেন্ডার বছরে ভারতের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৬.৮ শতাংশ করা হয়েছে। একই সাথে সার্বিক মূল্যস্ফীতির (হেডলাইন ইনফ্লেশন) পূর্বাভাস ০.২ শতাংশ কমিয়ে ৪.৪ শতাংশে এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি (ক্যাড) ০.২ শতাংশ কমিয়ে জিডিপির ১.১ শতাংশে নামিয়ে এনেছে তারা। গোল্ডম্যান স্যাকসের কমোডিটি টিমের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় ও চতুর্থ প্রান্তিকে তেলের গড় দাম ব্যারেল প্রতি আগের প্রাক্কলিত ৯২ ডলার থেকে কমে ৮২ ডলারে নামতে পারে এবং ২০২৭ সালে তা ৮০ ডলার থেকে কমে গড়ে ৭৫ ডলারে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের এই দরপতন ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে।
অর্থনীতির এই চাঙ্গা ভাবের আবহেই আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের মনে এখন প্রত্যাশার পারদ তুঙ্গে। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এবার শুধু অর্থনীতির সুবিধা নয়, রাজনৈতিক সমীকরণও বাজেটকে প্রভাবিত করবে। সামনেই পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, আসাম, তামিলনাড়ু ও পুдуচেরির মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে বিধানসভা নির্বাচন। ফলে ভোটারদের মন জয় করতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রাক্তনী যে একটি ‘জনমোহিনী’ বা লোকরঞ্জনবাদী বাজেট তৈরি করার চেষ্টা করবেন, তা বলাই বাহুল্য। সামষ্টিক অর্থনীতির এই স্বস্তি অর্থমন্ত্রীকে সাধারণ মানুষের পকেটে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
মধ্যবিত্ত করদাতাদের বড় একটি অংশ তাকিয়ে আছেন আয়করের দিকে। গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, এবারের বাজেটে নতুন কর কাঠামোতেও গৃহঋণের সুদের ওপর প্রায় দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয়কর ছাড়ের সুবিধা দেওয়া হতে পারে, যা বর্তমানে কেবল পুরোনো কর কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া স্বাস্থ্য বিমার ক্ষেত্রেও বড় কোনো ঘোষণা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী হয়তো বিমার প্রিমিয়ামের জন্য ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়করে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে খবর, নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে ইতোমধ্যে একপ্রস্ত আলোচনাও সেরেছেন তিনি। গত বছরের (২০২৫) সেপ্টেম্বরেই সরকার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য বিমার প্রিমিয়াম থেকে ১৮ শতাংশ জিএসটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে তা শূন্যে নামিয়ে এনেছিল। এবারের বাজেটে করের বোঝা আরও কমলে তা সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বস্তি হবে।
তবে শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিই নয়, বিশ্ববাজারের কিছু挑戰ও নির্মলা সীতারমণকে মোকাবিলা করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির কারণে আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে যে এক ধরণের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বাজেট ভাষণে তা থেকে উত্তরণের একটা সুনির্দিষ্ট দিশা অর্থমন্ত্রী দেখাবেন বলে আশা করছে ওয়াকিবহাল মহল। এছাড়া ঘরোয়া বাজারে জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর ঘোষণাও আসতে পারে এই বাজেটে।
এবারের বাজেটের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হতে যাচ্ছে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence)-এর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া। সরকার মূলত স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে এই প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চিকিৎসাক্ষেত্রে এক্স-রে মেশিনে এমন মেশিন লার্নিং মডেল যুক্ত করার কথা ভাবা হচ্ছে, যা রোগীর হাড়ের ছবি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবে। এআই-এর এই কার্যকর ব্যবহার চিকিৎসার খরচ সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।